বিদ্যুৎ একটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধানতম সঞ্চালক ব্যবস্থা। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখনো যথেষ্ট পিছিয়ে। এরমধ্যেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদ্যুতের সমস্যা অনেকটাই সমাধান হওয়ার পথে ছিল। কিন্তু সা¤প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে অন্য অনেক দেশের মতো বিদ্যুৎ-সংকটে পড়েছে বাংলাদেশও। এই সংকট নিরসনে প্রাথমিকভাবে সারাদেশে এক ঘণ্টার লোডশেডিংয়ের ঘোষণা দিলেও জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং আরও বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তারা বলেছেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয় বা কম ব্যবহারের কর্মসূচি ব্যর্থ হওয়ায় এটা করতে হচ্ছে। সারাদেশে এলাকাভিত্তিক দিনে এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের যে সময়সূচি দেয়া হয়েছিল, তা এরই মধ্যে বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। যদিও সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, এলাকাভিত্তিক দিনে এক ঘণ্টা করে বিদ্যুতের লোডশেডিং করা হবে। কিন্তু এজন্যে সরকার যে সময়সূচি ঘোষণা করেছিল, কাগজে কলমেই রয়ে গেছে। সারাদেশে মাঠের বাস্তবতার চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। মফস্বলের শহরাঞ্চলে দুই তিন ঘণ্টা বা তারও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। আর গ্রামাঞ্চলে পাঁচ ঘণ্টারও বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। এই পরিস্থিতি থেকে কবে উত্তরণ ঘটবে এই বিষয়ে স্পষ্ট দিক-নির্দেশনাও পাওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সম্প্রতি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে লিখেছেন, কয়েক মাসের মধ্যে আরও চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এ বিদ্যুৎ পায়রা তাপবিদ্যুৎ-কেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ভারতের আদানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে আসবে। এর ফলে বাংলাদেশ দ্রæতই বিদ্যুৎ সমস্যা কাটিয়ে উঠবে।
কিন্তু বাংলাদেশে বিদ্যুতের উৎপাদন, সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, গ্রিডে নতুন বিদ্যুৎ যুক্ত হতে এবছরও পেরিয়ে যেতে পারে। ফলে নতুন বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য কতটা বাস্তবসম্মত সে প্রশ্ন করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কোথা থেকে, কবে আসবে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ
বাংলাদেশে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য গত সপ্তাহে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো, সারাদেশে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং এবং সপ্তাহে একদিন পেট্রোল পাম্প বন্ধ রাখাসহ নানাবিধ পদক্ষেপ নেয় সরকার। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারি দফতরগুলোতে বিদ্যুতের ব্যবহার ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনাসহ নানা উদ্যোগ রয়েছে।
একই সাথে বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত না হবার অনুরোধ করে সরকারের বলেছে সেপ্টেম্বরের পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
শামীম হাসান
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মুখপাত্র এবং পরিচালক।
পায়রা তাপ-বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২য় ইউনিট, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ভারতের আদানি পাওয়ার প্ল্যান্টসহ মোট ৪টি উৎস থেকে ওই বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করছে সরকার।
পায়রাতে যে তাপ-বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে, সেখান থেকে আসবে বিদ্যুৎ। এরপর রামপালে যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে সেটাও চালু হয়ে যাবে এ সময়ের মধ্যে। আর ভারতের আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট, সব মিলিয়ে চারটি উৎস থেকে ৪০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমরা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করব। এটা অক্টোবরের শেষ থেকে ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে চলে আসার কথা।
বাংলাদেশে সাধারণ সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মতো, যা শীত মৌসুমে নেমে দাঁড়ায় নয় হাজার মেগাওয়াটে। ফলে নতুন বিদ্যুৎ না পৌঁছালেও শীতে চাহিদা কম থাকার কারণেই পরিস্থিতি সহনীয় থাকবে বলে কর্মকর্তারা আশা করছেন। এদিকে, বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলে জানা যাচ্ছে, পায়রা তাপ-বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২য় ইউনিট এবং রামপাল থেকে বিদ্যুৎ বিতরণের সঞ্চালন লাইন তৈরির কাজ এখনো হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী যে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রত্যাশার কথা লিখেছেন তার একটি অংশ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে এ বছরের শেষ নাগাদ।
গোলাম কিবরিয়া
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ।
রামপাল ও পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ঢাকায় বিদ্যুৎ আনার সঞ্চালন লাইন তৈরির কাজ শেষ হতে নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগবে। তিনি জানিয়েছেন, পদ্মাসেতু থেকে দুই কিমি দূরে সেতু কর্তৃপক্ষ এজন্য তাদের টাওয়ার তৈরি করে দিয়েছে। এখন ওটার উপর আমাদের উপকেন্দ্র স্থাপন করে তারপর লাইন টানতে হবে। কিন্তু বর্ষাকালে বজ্রপাত হয় বলে প্রাণের হুমকি আছে, ফলে কাজটি কিছুটা ধীরগতিতে করতে হচ্ছে। এটি শেষ হতে হতে নভেম্বরের শেষ বা ডিসেম্বরের শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি নভেম্বরের শেষ নাগাদই কাজ শেষ করতে।
আদানি পাওয়ার প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ আসবে কবে?
ভারতের আদানি পাওয়ার প্লান্ট থেকে সরকার ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটি এখনো বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেনি।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আদানি পাওয়ার প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরুর আগে দুইটি সঞ্চালন লাইন তৈরি হবে, একটি দিনাজপুরের রোহনপুরে, আরেকটি বগুড়ায়, যার কাজ এখনো শেষ হয়নি।
এর সঙ্গে উপকেন্দ্র তৈরি এবং উৎপাদন শুরুর আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে ‘অক্সিলারি বিদ্যুৎ’ নেয়ার কথা প্রতিষ্ঠানটির, সেটিও এখনো নেয়নি আদানি।
এসব পদক্ষেপ শেষ হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগবে, তারপরই শুরু হতে পারে তাদের উৎপাদন।
প্রত্যাশা বাস্তবা থেকে দূর
যেসব সূত্রে শীঘ্রই বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে তার কোনটাই সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারবে না। অর্থাৎ প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে।
অধ্যাপক এজাজ আহমেদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
সরকার যে সময়সীমার মধ্যে পরিস্থিতি উন্নতির আশা করছে সেটি বাস্তবসম্মত নয়। আমি মনে করি এটা সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত না, তারা একটা প্রত্যাশার ওপর নির্ভর করছে। মনে করা হয় সবকিছু যেরকম পরিকল্পিত, এমন হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি সব সময় তা হয় না। যেটা সঞ্চালন লাইন সেটাও কিন্তু প্রস্তুত হয়নি, আর পায়রা এবং রামপালের বিদ্যুৎ ওই একই লাইন দিয়ে আসবে। কিন্তু আদানির বিষয়টা আমাদের কাছে খুব স্পষ্ট না, যে ওইটা ঠিক কবে থেকে আসবে। কারণ ওইটা ঘোষণা করা হয়নি।
বর্তমান সমস্যার আশু সমাধানের জন্য সিস্টেম লসের নামে গ্যাস চুরি ঠেকানো এবং গ্যাস ক‚পে সংস্কার করে উৎপাদন বাড়াতে হবে।
বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংকটের মধ্যেও যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও অপচয় রোধ করা গেলে জনদুর্ভোগকে অনেকটাই সহনশীল মাত্রায় রাখা যাবে। তা না হলে ক্রমশ হাহাকার সৃষ্টি হবে। ক্ষোভ বাড়বে, অসহিষ্ণু হবে সাধারণ জনগণ। সেক্ষেত্রে প্রতিবেশী অনেক দেশের মতো অর্ধেক দিন অন্ধকারেও নিমজ্জিত থাকতে হতে পারে! সেই সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করতে না চাইলে জনসচেতনতার পাশাপাশি সরকারকে কঠিন ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে যা যা করা দরকার তা করাসহ বিদ্যুৎ বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্তা-কর্মীর যোগসাজশে পাওয়া অবৈধ লাইন বিচ্ছিন্নকরণ ও সিস্টেম লস সর্বোচ্চ কমিয়ে আনার ওপর জোর দিয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ব্যবস্থা নিতে হবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সুষমভাবে বণ্টনেরও। বায়োগ্যাসের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারি আনুক‚ল্যের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে মনোযোগী হতে হবে। সবদিক বিবেচনায় নিয়ে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে ব্যর্থ হলে চড়া মূল্য দিতে হবে জনগণ তথা সমগ্র দেশকে, যা কোনোভাবেই কারো কাম্য নয়।
নাজিম উদদীন, বিশেষ প্রতিবেদক।





Users Today : 50
Views Today : 53
Total views : 174606
