নিজেকে ভদ্রতার কাতারে নিয়ে যেতে পারলাম না, তাই তো কোনো মিটিং বা সভায় বসতে ইচ্ছে করে না আমার। মিথ্যে আর অসহিষ্ণুতায় ভরা মানুষের মন। কতটা জ্ঞানই বা আমার আছে যে আমি তাদের কথার প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করব। কতটা বুদ্ধিই বা আমার আছে যে আমি সেটা দিয়ে পরিচালনা করব। অনেক শত্রুতা যে আমার মধ্যেও কাজ করে। অনেক কিছু দেখেও না দেখার মতো করে চলতে হয় নিজের কৌশলিক বুদ্ধির অভাবে। আবার অনেক কিছুই আছে যা আমার দৃষ্টি সীমার বাহিরে। তাই তো নিজের ব্যক্তিত্বকে ঠিক রাখার জন্য নিজেকে একটু পিছিয়ে রাখাটাই যেন আমার জন্য একটু বেশি ভালো বলে মনে হয় ।
আজ যে যেখান থেকেই কথা বলছি, সে তার জানা সত্য থেকেই কথা বলে তার অবস্থান ঠিক রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আসলে এটাই বর্তমান পৃথিবীর একটা নিয়ম হয়ে গেছে যে, সে তার জানা সত্যটুকুই আসলে সত্য, আর এটাই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর এই সত্যের বাহিরে কোনো ধ্রুব সত্য নিয়ে কথা বললেও তা খণ্ডন করে নিজেরটাই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, এটাই আমাদের চেতনায় পরিণত হয়েছে। কোনো সংকট সমাধানের রাস্তা কেউই দেখিয়ে দেয় না। সবাই শুধু একে অন্যের দোষ ধরতে ব্যস্ত। তবে একটা কথা আমাদের প্রত্যেকেরই স্বীকার করা উচিত যে সত্য ও মিথ্যার সংমিশ্রণেই যেমন আমাদের জীবন চলে, তেমনই আমাদের সংগঠনগুলোও চলে। সংসার ঠিক রাখতে যেমন করে নিজেকে অনেক মিথ্যের আশ্রয়, কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়, তেমনই প্রতিটা ক্ষেত্রই এই নিয়মের বাহিরে নয়।
আমরা সবাই জানি বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনের পরে আরো দুই টার্ম তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন পরিচালনা করার কথা ছিল। এটা যেমন সত্য কথা, আবার এই সংবিধান বদল করে সেখান থেকে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে, সেটাও তো সত্য কথা। তাহলে কোন সত্যটা আসল সত্য, আর কোন সত্যটা মিথ্যে সত্য। সত্য আজ শক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে হয়। যার শক্তি বেশি, সত্য যেন অসহায় হয়ে তার দিকে গড়ে পড়তে বাধ্য হয়। আর এই সত্যকে যার যার মতো করে প্রতিষ্ঠিত করতে ভদ্রতা আর থাকে না। যে ভদ্রতা আমাদের হৃদয়ের একটা বিশেষ গুণ। এই গুণের মধ্যে বাহ্যিক অনেক কিছু পাওয়া না গেলেও আমার মনে হয় জীবনে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে বেঁচে থাকা যায়। আমরা কারো দোষ খুঁজতে খুঁজতে নিজেকেই কখন যে দোষের মধ্যে ফেলে দেই তা বুঝতে পারি না। আমি শুধু আমার চাহিদার মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করে যাই। ভাবনায় আসে না আমি কি করছি, আমার বাহ্যিক আকৃতি কী। আমি কীভাবে কথা বলছি। আমাদের কথা বলার পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত আর কেমন হওয়া হচ্ছে।
নিজের ব্যক্তিত্বকে ধরে রাখার জন্য চেষ্টা করা আমাদের প্রত্যেকেরই কর্তব্য। জীবন চলার পথে আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই ভুল রয়েছে। ইতিহাস দেখলে দেখা যায় প্রতিটা সফল ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব তাকে সফলতার দিকে নিয়ে গেছে। আসলে সঠিক ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারিনি তো তাই প্রতিটা কাজেই অপ্রস্তুত ও লজ্জিত মনে হয় আমার। পারিনি নিজের মধ্যে ক্ষমার মানুষিকতা তৈরি করতে। পারিনি নিজে ছাড় দিতে। আমরা সব জানি কিন্তু কিছুই জানি না। যেমন করে বুঝতে পারিনি আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়কে। যেখানে লেখা ছিল ‘‘অসমতার বিরুদ্ধে লড়াই করি, দুর্যোগ সহনশীল জীবন গড়ি’’। এই অসমতা ও সহনশীল এই দুটোর অর্থ এখানে কীবুঝিয়েছেন সেটা আমার জানার বাহিরে। আসলে আমরা যতোই জানি না কেন আমাদের জানার বাহিরেও অনেক না জানা জিনিস থাকে। তাই তো জানাগুলো নিয়ে সমালোচনা না করে অজনা বিষয়গুলো জানতে চেষ্টা করাই আমাদের উচিত। আজ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে অনেক কৌশলী ভূমিকা পালন করতে হয়। চিন্তা, আবেগ, উত্তেজনা, অস্থিরতা, উদ্বেগ কোনোদিনই সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এটার জন্য নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে নিজের শ্বাসের লাগাম টেনে ধরতে হয়। বিবেকের কাছে বার বার প্রশ্ন করতে হয়। আজ আমরা সবাই কেমন যেন বরফের মতো শক্ত হয়ে গেছি কিন্তু বরফ থেকে তরল, তরল থেকে বায়বীয় হওয়ার যে শিল্পকলা প্রতিটা মানুষের মধ্যেই আছে সেটার ব্যবহার ভুলে গেছি। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে আজ ব্যস্ত। আর সেই প্রতিষ্ঠিততাকেই নিজের ব্যক্তিত্বের জয় বলে ধরে নেই। কিন্তু ব্যক্তিত্ব বলতে কোনোভাবেই অপর কাউকে যেকোনোভাবে জয় করা বুঝায় না। এটা এমন একটা শক্তি যার প্রভাবে মানুষ আপনা আপনিই বশ হয়ে যায়। আবার এটা মুহূর্তের মধ্যে আমাদের সতর্কতার অভাবে নষ্টও হয়ে যেতে পারে, সেটার ব্যপারেও আমাদের সাবধান থাকা উচিত। কেননা এটা তৈরি করতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। একজন সাধুকে কেনো একজন ব্যক্তি রাগান্বিত হয়ে বলেছিলেন যে, আমি তোমার চেয়ে বেশি ভদ্রলোক ও বেশি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। আর সেই সাধু তার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠে বলেছিলেন, এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। কারণ এই জগতে যত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ তৈরি হবে ততই ভালো। আমি কেন ঐ সাধুর মতো নিজেকে অবনত করতে পারি না। কেন অন্য মানুষের শক্তি ও গৌরব স্বীকার করতে বা মেনে নিতে পারি না। পবিত্র বাইবেলের হিতোপদেশ ১:৭ পদে লেখা আছে, যাদের বিবেক অসাড় তারা সব বুদ্ধি ও শিক্ষা তুচ্ছ করে। তাই আসুন নিজের বিবেকের দরজা খুলে দিই। মনের মধ্যে বরফ থেকে তরল ও তরল থেকে বায়বীয় হওয়ার যে শিল্পকলা তাকে অনুশীলন করি।






Users Today : 78
Views Today : 92
Total views : 174645
