বিগত বছরের শুরুতে ১৫ জানুয়ারিতে ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড’ (এনসিটিবি) অভিমুখে প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করেছিল―‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র সমাজ’। কারণ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরবর্তীকালে পাঠ্যপুস্তক থেকে আদিবাসী শব্দ সংবলিত গ্রাফিতির পরিবর্তে অন্যকিছু সংযোজিত করা হয়। এটি নিয়ে আদিবাসীরা উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন। সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র সমাজ ব্যানারে পাঠ্যবইয়ে গ্রাফিতি পুনর্বহালসহ ৫ দফা দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এনসিটিবি ভবনের দিকে। বিপত্তি ঘটে স্টুডেন্টস্ ফর সভরেন্টি সংগঠনের সমর্থকদের সাথে পথিমধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আদিবাসী শিক্ষার্থী মারাত্মকভাবে আহত হোন। এটি ছিল―স্টুডেন্টস্ ফর সভরেন্টি’র পরিকল্পিত আক্রমণ। সেদিন মতিঝিলের রাজপথ আদিবাসীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। সরকার নীরব ভূমিকা পালন করলেও দেশের বিশিষ্টজনেরা বলেছেন―ভিন্ন মত, পথ ও সাংস্কৃতিক চর্চার বিপরীতে উত্থিত ধর্মান্ধ উগ্রবাদী মনস্তত্ত্ব গঠনের প্রবণতাকে রুখে দিয়ে দেশের সব মত, পথ, ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার উপযোগী রাষ্ট্র বিনির্মাণে সংবেদনশীর রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলতে মনোনিবেশ করা জরুরি। অদ্যাবধি প্রান্তিক নাগরিক আদিবাসীরা সামান্যতমও ইতিবাচক পরিবর্তনের ছোঁয়া পাননি।
২০২৫ সালেও খোলা চোখে ধরা পড়েছে―সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসী জাতিসত্ত্বাসমূহ অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে দিন যাপন করছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হতে হতে আজ তারা অসহায় ও দিশেহারা। বসবাসরত আদিবাসীদের অত্যাচার-নির্যাতনের তথ্য উপাত্তের কোনো হেরফের হয়নি। পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভূমিকেন্দ্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে কমপক্ষে ১৫টি। ৩৪টি রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যেখানে মোট ৩৬৮ জন আদিবাসী মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। পাহাড় ও সমতল মিলিয়ে গ্রেপ্তারের পর মৃত্যু, বিনা বিচারে আটক, মারধর, হেনস্তা এবং জোর করে ধর্মান্তরিত করার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে দাঁড়িয়েছে। এ সকল ঘটনাগুলোর একটিরও যথাযথ তদন্তপূর্বক সুষ্ঠু বিচার নিস্পত্তি হয়নি। এ সময়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার নারীদের ওপর ২৪টি নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ২১টি ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে, তিনটি সমতলে। ছয়জন নারী ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দু’জন নিহত হয়েছেন।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে বাঙালি সেটলার এবং জুম্ম আদিবাসীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্ততঃ ৩ জন নিহত হোন এবং ১৫ জন আহত হোন। এছাড়াও ডিসেম্বরের শেষ দিকেও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের খবর পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে আদিবাসীদের ওপর মোট ৯৭টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। এতে ভূমিকেন্দ্রিক ঘটনা ঘটেছে ১৮টি, যার মধ্যে সমতলে ৪টি ও পাহাড়ে ১৪টি এবং মোট ১০০৭ জন আদিবাসী নাগরিক ঘটনার শিকার হয়েছে। পাশাপাশি মোট ৬১টি ঘটনায় ৩৪১ জন ব্যক্তি রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছিলেন, যেখানে ৩টি ও ৫৮টি ঘটনা যথাক্রমে সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তীকালে নির্যাতিত-নিপীড়ত, অত্যাচারিত ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার মানুষেরা তারা তাদের অধিকার ফিরে পাবে বলে স্বপ্ন দেখেছিলেন; কিন্তু তাদের সেই আশাভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগেনি। জুলাই গণ-অভ্যূত্থানে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গিকার ও প্রত্যাশা ছিলো আদিবাসীদের, সেটি তো দূর হয়নি; বরং বৈষম্যের নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। একটির পর একটি ঘটনা ঘটেছে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের সর্বত্রই। এহেন বর্বরোচিত হামলা, অত্যাচার-নির্যাতন তথা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী। আদিবাসী নারী-পুরুষেরা বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন কিন্তু উপরওয়ালা স্রষ্টার কাছেই বিচারের ভার দিয়েছেন; কেননা তিনিই তো ন্যায় বিচারক। ২০২৫ সালের আদিবাসী দিবস পালিত হয়েছে শঙ্কা ও মন্ত্রণালয়ের খড়্গ নিয়ে। অতীতে বার বার ‘আদিবাসী’ শব্দটি প্রত্যাহারের বিষয়ে সরকারি, বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানসমূহকে বাধ্য করা হয়েছিল; সেটিকেই বর্তমান সরকারও বহাল রেখেছেন। বর্তমান সরকারও আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সম্বোধন এবং সরকারিভাবে দিবস উদ্যাপন আয়োজনে আগ্রহ দেখাননি।
বর্তমান সময়েও আদিবাসীরা জমিজমা সংক্রান্ত সমস্যায় জর্জরিত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ আদিবাসী মানুষজন ভূমিহীন। পটুয়াখালী ও বরগুনার রাখাইন পল্লী থেকে শুরু করে মধুপুরের গারো জনপদ সবখানেই চলছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ ও জমি দখলের মহোৎসব। উনবিংশ শতাব্দির ত্রিশ দশকে যেখানে উপকূলীয় অঞ্চলে ২৩৭টি রাখাইন গ্রাম ছিল, আজ তা বিলুপ্তির পথে। জাল দলিল, হুমকি আর আইনের ফাঁক ফোকর ব্যবহার করে এই প্রান্তিক মানুষদের পৈত্রিক ভূমি থেকে উচ্ছেদিত হতে হচ্ছে। আদিবাসী উচ্ছেদের সর্বশেষ ঘটনা দেখলাম রাজশাহী গোদাগাড়ীর কোল পল্লীতে ২৭ অক্টোবর, ২০২৫ সালে। স্মরণাতীতকাল থেকে বিলুপ্ত প্রায় আদিবাসী কোলরা এতদ্অঞ্চলের কয়েকটি গ্রামে বসবাস করে আসছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা ৫টি কোল পরিবারকে ভিটেছাড়া করেছেন, ফলস্বরূপ অন্য পরিবারগুলোও নড়েচড়ে বসেছেন। বিগত ২৯ ডিসেম্বর পুনর্বার পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছিল, বিকেলের কুয়াচ্ছন্ন আবহাওয়ায় তাদের মুখায়বে ছিলো অনিশ্চয়তার ছাপ। কখন কে এসে পুরো গ্রামকেই না উচ্ছেদ করে বসে! ইতোমধ্যেই আরো একজন দুজন করে গ্রাম ছাড়তে শুরু করেছেন। বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তের কোল আদিবাসীদের পাশে এখনই দাঁড়ানোর মোক্ষম সময়। সত্যিকার অর্থেই আদিবাসীরা বসত ভিটা এবং জমি জিরাত নিয়ে নিরাপত্তাহীনতা ভুগছেন। জীবনের সাথে যুক্ত জমি, জঙ্গল, জলা এখন তাদের বিষেফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশে বসবাসরত আদিবাসীদের প্রতি সব ধরনের বৈষম্য ও সহিংসতা বন্ধ করতে একটি কার্যকর বৈষম্য বিরোধী আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইনে বিশেষ বিধান যুক্ত করা আবশ্যিক। একই সাথে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেশনশনের ১৬৯ অনুসমর্থন এবং জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নে যত্নশীল হওয়া। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সমতলের আদিবাসীদের ভূমি বিরোধ নিস্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন ও কার্যকর পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা সময়ের দাবি। সর্বোপরি, আদিবাসী হিসেবে স্পষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি নিশ্চিত করা। সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও ন্যায্যতাপূর্ণ আচরণের মধ্যে দিয়েই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে মনে করি।





Users Today : 4
Views Today : 4
Total views : 171739
