মহান জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী নির্বাচনে জল্পনা-কল্পনা তুঙ্গে রয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের নীতি নির্ধারকেরা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘যারা আমাদের দুঃসময়ের পরীক্ষিত কর্মী, তাদের ব্যাপারটা আমার অগ্রাধিকার দেব।’ বিশেষত যারা দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করছেন, যাদের মা-বাবা দলের জন্য অবদান রেখেছেন—এই বিষয়গুলো গুরুত্বারোপ করা হবে। আরেকটি দিক বিবেচনাধীন রেখেছে, যারা দলের মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, যারা দলের মনোনয়ন পেয়ে পরে জোটের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন, তাদের অনেকেই সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হতে সুযোগ দেওয়া হবে। এটি মূলত মহিলা সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন প্রদানের পূর্বশর্ত বা মানদণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ঊর্ধ্বতন নেতাকর্মীর ভাষ্যও একইরকম। সংরক্ষিত আসনে সাংসদ হওয়ার দৌড়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ৫/৭ জনের নাম তালিকার শীর্ষে রয়েছে। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা আওয়ামী লীগ, সাবেক একাধিক ও বর্তমান নেত্রী এবং সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকে সাংসদ হিসেবে বেছে নেওয়া হতে পারে। অপরদিকে জেলা কোটাও আলোচনাতে বেশ সরগরম। নির্বাচিতরা হবেন, দক্ষ, সৎ, ত্যাগী এবং জনসাধারণের আস্থাভাজন ব্যক্তিত্ব। সার্বিক দিক বিশ্লেষণে অনুমিত হয় যে, ইতোপূর্বে এক বা একাধিকবার যারা সংরক্ষিত আসনে সদস্য হয়েছেন, বাদ পড়ার তালিকায় তাদের রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘একজন যেন বারবার সংসদ সদস্য না হয়, সেদিকটা আমরা বিবেচনা করব।’ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হিসাব অনুযায়ী, মহিলা সংরক্ষিত আসনে দলগতভাবে ৩৮টি, স্বতন্ত্র থেকে ১০ মিলিয়ে ৪৮ জনকে মনোনয়ন দেয়া হবে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কৌশল অনুযায়ী উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীরা সংরক্ষিত আসনের জন্য কতটা উপযুক্ত! বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ’৭০ এর নির্বাচনেও আদিবাসীরা স্বতঃর্স্ফূতভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। শত্রুসেনা বিতাড়নে আদিবাসী মায়েরা যুব সন্তানদের মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণে উজ্জীবিত করেছে। অনেক জায়গায় মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ানোর দায়িত্ব নিয়েছিলে, শরণার্থী শিবিরে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন; শত্রুসেনাদের পরাজিত করতে রংপুর ক্যান্টমেন্ট ঘেরাও আন্দোলনে সামনের সারিতেই উপস্থিত থেকেছেন। উত্তরবঙ্গের আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁও, মুণ্ডা, রায়, বর্মন, কোল, কোডা, ভূঁইয়া, মুসহড়, পাহান জনগোষ্ঠীর শহীদের তালিকা ক্রমশই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সুবর্ণ জয়ন্তীতেও মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় আদিবাসীদের যর্থাথ মূল্যায়ন সম্ভবপর হয়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণ ছিলে উল্লেখযোগ্য। অনেক নারী পাকসেনা কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, বীরাঙ্গনা হয়ে সমাজের স্বীকৃতি পেতেও বেগ পেতে হয়েছে। অতঃপর অদ্যাবধি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে চলেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচনগুলোতে অলিখিতভাবেই আদিবাসীরা বিশ্বস্তভাবে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আসছে। অগ্রজরা কৃতজ্ঞতায় স্বীকারোক্তি করে থাকেন, দেশের ক্রান্তিকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের যে মহানুভবতা, তাঁর নামেই গুণেই দীর্ঘদিন শরণার্থী শিবিরে খাদ্য, চিকিৎসা ও বসবাসের সংস্থান হয়েছিলে। বোধ করি, একমাত্র আদিবাসীরাই অর্ধশতকাল পর্যন্ত শেখ মুজিব ও তার কন্যার প্রতি ভালোবাসায়, কৃতজ্ঞতায় নিজ নিজ ভোট নৌকাতে দিয়ে থাকে। স্থানীয় নৌকার প্রার্থীরা আদিবাসীদের অন্যায়-অবিচার, উচ্ছেদ-দখল প্রক্রিয়ায় সামিল হলেও ঠিকই সরকার গঠনের প্রাক্কালে নৌকার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এতো ভালোবাসা, আস্থা, বিশ্বাস এবং আদর্শ গ্রহণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞদের প্রতি প্রতিদান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নৈতিক দায়বদ্ধতা রয়েছে।
উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল নারী সারা মারাণ্ডী, উরাঁও জনগোষ্ঠী থেকে সাবিনা এক্কা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের রঞ্জনা বর্মন সংরক্ষিত নারী আসনের জন্যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশ ও দশের, সমাজ ও রাষ্ট্র উন্নয়নে সামর্থ্যনুযায়ী অবদান রেখে চলেছেন। দলীয় আনুগত্য ও রাজনৈতিক কর্মকা-ে যথেষ্ট সক্রিয়তা রয়েছে; অনগ্রসর আদিবাসীদের জনগোষ্ঠীর তুলনায় এটিতেও অনেক অনেক দুর্লঙ্ঘনীয় পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। যেসব আদিবাসী নারীরা মাঠের কাজে পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে; নিঃসন্দেহে বলা যায়, এলাকার কল্যাণমূলক কাজে নিজেদেরকে উৎসর্গীকৃত করতে পারবে। এখন প্রয়োজন সুযোগ সৃষ্টি, প্রতিযোগিতায় নয়, মেধাভিত্তিক নয় কিন্ত অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনায় আদিবাসী নারীরা ঠিকই নিজেদেরকে মেলে ধরতে পারবে।
২০০৪ সালে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনে নারী আসন ৩০টি থেকে বাড়িয়ে ৪৫ করা হয়। ২০০৯ সালে ৪৫ থেকে তা ৫০ করা হয়। ২০০৪ সালে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত ৪৫টি নারী আসনের মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয় পরবর্তী সংসদের অর্থাৎ নবম সংসদের প্রথম বৈঠক থেকে দশ বছর। নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি। সেই হিসেবে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যের মেয়াদ আছে ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংরক্ষিত নারী সদস্যদের সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। ২০১১ সালে ৫০ আসনই নতুন করে ২৫ বছর মেয়াদের জন্য বহাল রাখা হয়েছে। নতুন আইনে ১০ বছরের জায়গায় ২০ বছরের প্রস্তাব রাখা হয়েছিলো, কিন্তু মন্ত্রিসভা সেটাকে আরো বাড়িয়ে ২৫ বছরের অনুমোদন দিয়েছে। ফলে একাদশ সংসদের প্রথম বৈঠক থেকে শুরু করে পরবর্তী ২৫ বছর পর্যন্ত সংরক্ষিত আসনের বিধি কার্যকর থাকবে।
জাতীয় সংসদে মহিলা সংরক্ষিত আসনের বর্ধিত ২৫ বছরের অর্ধেক বছর অতিক্রান্ত করেছে। সময় এবং গণতন্ত্রের শক্ত অবস্থানের প্রেক্ষিতে এক সময় মহিলা সংরক্ষিত আসন প্রয়োজনীয়তা নাও হতে পারে! বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, দীর্ঘ ৫০ বছরের অধিক সমগ্র উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীরা সংরক্ষিত আসনের সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে; আর এখনও যদি এড়িয়ে যাওয়া হয়, তাহলে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে বৈষম্যের সামগ্রিক চিত্র প্রতীয়মান হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী ও জনবান্ধব শাসন ব্যবস্থা প্রণয়নে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়ে আসছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের নেতৃত্ব উন্নয়নে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।






Users Today : 60
Views Today : 63
Total views : 174616
