২০০১ সালে দুজন ফিলিপিন্স থেকে আগত নারী-পুরুষ ‘ন্যাশনাল খ্রিস্টিয়ান ফেলোসিপ অফ বাংলাদেশ’ অফিসে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেদিন তাদের সাথে আদিবাসীদের ভাষা উন্নয়নে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়ে আলাপ হয়েছিল, পরবর্তিতে সাধারণ সম্পাদক ড. ডেনিস দিলীপ দত্তের কয়েক দফা আলোচনা করেছিলেন। সেদিনই প্রথম এসআইএল সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলাম। এই প্রতিষ্ঠানই ক্রমেই মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বিগত ৮ই নভেম্বর অনুষ্ঠিত রজত-জয়ন্তীতে আমন্ত্রিত হয়ে রাজধানীর একটি পাঁচতারা হোটেলে উপস্থিত হয়েছিলাম। দেশের সর্বপ্রান্ত থেকে আগত আদিবাসী প্রতিনিধি ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক টিম পৌঁছেছিলেন। জেনেছি—সাঁওতাল, মান্দি, মাহালী, উরাঁও, কোল, কোডা, কোচ, ত্রিপুরা, রাজোয়াড়, তুরী, মাহাতো, হাজং জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
এসআইএল ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এ পর্যন্ত দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে প্রায় ২৭টিরও বেশি ভাষা উপর প্রকল্প পরিচালনা করেছে। আর ভাষা সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ২৯টি সম্প্রদায়ের সাথে সমাজ-ভাষাগত জরিপ (Sociolinguistic Survey) পরিচালনা করছে। প্রকল্পিত ভাষাগুলো হচ্ছে—বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, কোল, কোডা, কোচ, হাজং, বম, চাকমা, গারো, খ্যাং, ত্রিপুরা/ককবরক, কুরুখ, লুসাই, মাহালী, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা। তথ্যানুযায়ী, ৪০টির বেশি ভাষা প্রচলিত রয়েছে, আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে—সরকারও সঠিক চিত্র উপস্থাপন করতে পারে নাই। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে, ৩৬ থেকে ৪৪টির মধ্যে আদিবাসীদের মাতৃভাষা এখনো কোনো রকমে বেঁচে টিকে আছে; যে কোনো সময় বিলুপ্তির খাতায় নাম ট্রান্সফার হয়ে যাবে। নিম্নোক্ত ভাষাগুলো ব্যতিত অন্যান্য ভাষাগুলোও আগামীতে প্রকল্পের আওতায় আনা হবে বলে বিশ্বাস করি।
• বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী—২০০৩ সাল থেকে এই ভাষা গোষ্ঠীর সাথে কাজ করছে এবং শিক্ষা উপকরণ ও বানান নির্দেশিকা নির্মিত হয়েছে;
• কোল—২০১০ সালে এই সম্প্রদায়ের সাথে কাজ শুরু করে এবং বিলুপ্ত প্রায় জাতিগোষ্ঠীর প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা উপকরণ ও গল্পের বই তৈরি করেছে।
• কোডা—২০০৯ সাল থেকে এই ভাষাভাষীদের সাথে পথচলা শুরু হয় এবং হারিয়ে যেতে বসা ভাষায় ইতিমধ্যেই অনেকগুলো গল্পের বই প্রণীত হয়েছে।
• কোচ (Koch – Tintekia dialect)—২০১১ সাল থেকে ভাষাটির লিখন পদ্ধতি ও শিক্ষা উপকরণ তৈরিতে সহায়তা করেছে।
• হাজং—এই সম্প্রদায়ের জন্য প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা উপকরণ তৈরিতে সহায়তা করেছে।
• বম (Bawm Chin)—বম ভাষায় লিখন পদ্ধতি এবং অন্যান্য উপকরণ তৈরিতে কাজ করেছে।
• মাহালী—২০০৬ সাল থেকে লিখন পদ্ধতি চূড়ান্ত করা হয় এবং শিক্ষা উপকরণ তৈরি করা হয়েছে।
• গারো (Garo – Abeng, Achik, Brak, Chibok, Dual)—সমাজ ভাষাগত জরিপ সম্পন্ন হয়েছে।
• বাংলা—মূলধারার শিক্ষার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক উপকরণ তৈরি এবং অন্যান্য প্রকাশনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে চলেছ।
এছাড়াও চাকমা, খ্যাং, ত্রিপুরা/ককবরক, কুরুখ, লুসাই, মারমা, ম্রো এবং তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার কাজ করা হয়েছে। এই কাজের মধ্যে সমাজ ভাষাগত জরিপ, লিখন পদ্ধতি (orthography) উন্নয়ন, পাঠ্যপুস্তক তৈরি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম অন্তর্ভূক্ত রয়েছে।
এসআইএল একটি অলাভজনক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত বা বিলুপ্ত প্রায় ভাষাগুলো অধ্যয়ন, পুনরুজ্জীবিতকরণ এবং নথিভুক্ত করার জন্য প্রাণান্ত কাজ করে। ভাষাভাষীদের মুখের ভাষাকে প্রচলিত করতে বিভিন্ন পন্থা ও কৌশল অবলম্বন করে ব্যবহারে উজ্জীবিত করে থাকে। এসআইএল দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে থাকা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা তথা আদিবাসীদের খুঁজে বের করে বহুভাষিক শিক্ষা ও জীবনমানের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। স্থানীয় ভাষা কমিটি, সরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় অন্যান্য এনজিওদের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে কাজগুলোকে সাবলীল করে তুলেছে। কেননা কাজগুলো স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, প্রত্যাশা-চাহিদাগুলোকে সম্পৃক্ত করতে সমর্থ হয়েছে। মূলতঃ ভাষা উন্নয়নের বৈচিত্র্যময় কাজগুলো সম্পন্ন করাই হলো প্রধান লক্ষ্য। যেমন—
ভাষাগত গবেষণা ও ডকুমেন্টশেন (Linguistic Research & Documentation)
১. সমাজ-ভাষাগত জরিপ (Sociolinguistic Surveys) বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভাষার ব্যবহার, জীবনীশক্তি (vitality) এবং শিক্ষার প্রতি মনোভাব বোঝার জন্য জরিপ পরিচালনা করা। এর মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় কোন ভাষাগুলো সংরক্ষণের জন্য অগ্রাধিকার প্রয়োজন।
২. গবেষণা ও বিশ্লেষণ: ভাষাবিদরা স্থানীয় ভাষাগুলোর ধ্বনিতত্ত্ব (phonology), ব্যাকরণ (grammar) এবং শব্দভাণ্ডার (lexicon) বিশ্লেষণ করেন।
৩. নথিকরণ: যেসব ভাষা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে ও ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোর কথ্যরূপ এবং লোকগাঁথার গল্পগুলো বা গান নথিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করা হয়।
লিখন পদ্ধতি এবং উপকরণ তৈরি (Orthography & Materials Development)
১. লিখন পদ্ধতি (Orthography) উদ্ভাবন: অনেক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর ভাষার নিজস্ব কোনো লিপি বা সুনির্দিষ্ট লিখন পদ্ধতি ছিল না। এসব ক্ষেত্রে এসআইএল সেসব প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর সাথে নিবিড়ভাবে মতবিনিময় ও সংলাপ করে যৌথভাবে একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য লিখন পদ্ধতি (প্রায়ই বাংলা বা রোমান লিপি ব্যবহার করে) তৈরিতে সাহায্য করেছে।
২. অভিধান ও শব্দকোষ: অত্যন্ত যত্নের সাথে ভাষাভাষীর জন্য ছোটো বা মাঝারি আকারের অভিধান এবং শব্দকোষ সংকলনে সহায়তা করেছে।
৩. শিক্ষামূলক উপকরণ তৈরি: বর্ণমালা বই, গল্পের বই, ছড়া, স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক বই এবং অন্যান্য পাঠ্যপুস্তক তৈরি করে যা মূলতঃ মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়।
শিক্ষা কার্যক্রম এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি (Education Programs & Capacity Building)
১. মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা (MTB-MLE): এসআইএল-র অন্যতম কাজের দিকসমূহ। প্রাক্ প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে শিশুদের নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের সুযোগ তৈরি করে। এর মাধ্যমে ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা দ্রুত শিখতে পারে এবং মূলধারার শিক্ষায় যুক্ত হতে পারে।
২. শিক্ষক প্রশিক্ষণ: স্থানীয় শিক্ষকদের মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি এবং উপকরণ ব্যবহারে দক্ষ প্রশিক্ষক দ্বারা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
৩. সাক্ষরতা কর্মসূচি: শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাক্ষরতা ক্লাস পরিচালনা এবং উপকরণ সরবরাহ করা হয়।
প্রযুক্তিগত সহায়তা (Technical Support)
১. সফ্টওয়ার ও ফন্ট: ভাষাগত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটার ফন্ট এবং সফ্টওয়্যার ব্যবহারে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হয়, যাতে স্থানীয় ভাষাভিত্তিক কাজ করা সহজ হয়।
অ্যাডভোকেসি ((Advocacy))
১. ভাষার অধিকার সচেনতনা: এসআইএল স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা এবং ভাষা সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে।
স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে এসআইএল ২২টি ভাষাতে (বম, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, চাকমা, গারো, হাজং, খাসিয়া, খিয়াং, কোচ, কোল, লুসাই, মাহালী, মেইতে মণিপুরী, ম্রো, মুণ্ডা, উরাঁও—কুড়ুঁখ, ওরাঁও সাদ্রী, পাহাড়ি, পাংখোয়া, সাঁওতাল, তঞ্চঙ্গ্যা, উসুই ত্রিপুরা, কোডা, বাংলা এবং ইংরেজিতে) ৭ই মার্চের ভাষণ সংকলন করেছিল। ফলস্বরূপ প্রত্যেকটি ভাষার জাতিগোষ্ঠী নিজস্ব মাতৃভাষায় স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করতে সক্ষম হয়েছে। এক কথায়—এসআইএল বাংলাদেশের আদিবাসীদের মাতৃভাষাগুলোকে কেবল গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে নি; বরং সেগুলোকে জীবন্ত রাখতে এবং শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য সামগ্রিক উন্নয়নমূলক কাজ করে চলেছে। এসআইএল-র পথচলা মসৃণ ও কণ্টকমুক্ত হোক, এটিই রজত-জয়ন্তীতে আমাদের প্রার্থনা।






Users Today : 60
Views Today : 63
Total views : 174616
