‘‘ভয় পেয়ো না; তোমরা যাঁর খোঁজ করছ, সেই ক্রুশে দেওয়া নাসরতীয় যীশুকে আমি জানি। তিনি এখানে নেই, কারণ তিনি পুনরুত্থিত হয়েছেন। এসো, যেখানে তাঁকে রাখা হয়েছিল সেই জায়গাটি দেখ।’’ (মথি ২৮:৫-৬)।
মহিলারা আনন্দ ও বিস্ময় নিয়ে শিষ্যদের এই খবর দিতে দৌড়ে গেলেন। পথে খোদ যীশু তাঁদের দেখা দিলেন এবং তাঁরা তাঁকে প্রণাম করলেন। পরে যীশু তাঁর শিষ্যদের কাছেও আবির্ভূত হয়েছিলেন।
আরোও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বাইবেলের পদ, আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
মথি ২৮:১-১০: পুনরুত্থানের সকালের বিস্তারিত বিবরণ।
মার্ক ১৬:১-৮: স্বর্গদূত কর্তৃক যীশুর জীবিত হওয়ার ঘোষণা।
লূক ২৪:১-১২: শূন্য কবর এবং স্বর্গদূতদের সাথে মহিলাদের কথোপকথন।
যোহন ২০:১-১৮: যীশু ও মগ্দলিনী মারীয়ার দেখা হওয়া।
যোহন ১১:২৫: যীশু বলেছিলেন, ‘‘আমিই পুনরুত্থান ও জীবন; যে আমাতে বিশ্বাস করে, সে মরিলেও বাঁচিবে।’’
খ্রিস্টীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, যীশু মারা যাওয়ার তিন দিন পর জীবিত হয়ে ওঠেন, যা পাপ ও মৃত্যুর ওপর তাঁর বিজয়কে প্রকাশ করে। এই ঘটনাটি ইস্টার বা পুনরুত্থান রবিবার হিসেবে পালিত হয়।
ব্যাখ্যা:
যীশু খ্রিষ্টের পুনরুত্থান কেবল একটি অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং এটি খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের প্রাণকেন্দ্র। এর গভীর তাৎপর্যগুলো নিচে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
ঈশ্বরের সত্যতা ও প্রতিশ্রুতির প্রমাণ যীশু তাঁর পরিচর্যার সময় বারবার বলেছিলেন যে তাঁকে মৃত্যু বরণ করতে হবে এবং তৃতীয় দিনে তিনি পুনরুত্থিত হবেন (মথি ১৬:২১)। তাঁর পুনরুত্থান প্রমাণ করে যে তিনি যা বলেছিলেন তা সত্য ছিল। এটি তাঁর ঈশ্বরত্ব এবং মসীহ হওয়ার অকাট্য প্রমাণ। পাপ ও মৃত্যুর ওপর চূড়ান্ত বিজয় বাইবেল অনুযায়ী, পাপের ফল হলো মৃত্যু। যীশু নিজে নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও মানুষের পাপের বোঝা নিয়ে ক্রুশে প্রাণ দিয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যু তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। তাঁর পুনরুত্থান ঘোষণা করে যে পাপের শক্তি পরাজিত হয়েছে এবং মৃত্যু আর মানুষের শেষ গন্তব্য নয়।
‘‘হে মৃত্যু, তোমার জয় কোথায়?’’ (১ করিন্থীয় ১৫:৫৫)।
যীশুর পুনরুত্থান আমাদের এই নিশ্চয়তা দেয় যে ঈশ্বর যীশুর আত্মত্যাগকে গ্রহণ করেছেন। যীশু যদি পুনরুত্থিত না হতেন, তবে আমাদের বিশ্বাস হতো ভিত্তিহীন। রোমীয় ৪:২৫ পদে বলা হয়েছে, আমাদের অপরাধের জন্য তাঁকে তুলে দেওয়া হয়েছিল এবং আমাদের ধার্মিক প্রতিপন্ন করার জন্য তাঁকে জীবিত করা হয়েছে। পুনরুত্থানের ফলে বিশ্বাসীরা কেবল পরকালেই নয়, বরং এই পৃথিবীতেই এক ‘নতুন জীবন’ লাভ করে। যীশু পুনরুত্থিত হয়ে স্বর্গে যাওয়ার পর পবিত্র আত্মাকে পাঠিয়েছেন, যা বিশ্বাসীদের শক্তি ও সান্ত¡না দেয়। এটি আমাদের পুরনো পাপী স্বভাব থেকে মুক্তি দিয়ে নতুন মানুষ হিসেবে বাঁচার প্রেরণা জোগায়। যীশুর পুনরুত্থান অনন্ত জীবনের নিশ্চয়তা (প্রথম ফল) বাইবেলে যীশুর পুনরুত্থানকে বলা হয়েছে ‘প্রথম ফল’ (১ করিন্থীয় ১৫:২০)। এর মানে হলো, যেহেতু যীশু পুনরুত্থিত হয়েছেন, সেহেতু যারা তাঁকে বিশ্বাস করে তারাও একদিন মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত হবে। এটি আমাদের শোক ও কষ্টের মাঝেও এক অদ্ভুত শান্তি ও অনন্ত জীবনের আশা দেয়। যীশুর শিষ্যরা তাঁর মৃত্যুর পর ভয়ে পালিয়েছিলেন ও লুকিয়ে ছিলেন। কিন্তু পুনরুত্থিত যীশুর দেখা পাওয়ার পর তাঁদের মধ্যে এক অলৌকিক সাহস সঞ্চার হয়। তাঁরা নির্ভয়ে সুসমাচার প্রচার শুরু করেন। এর তাৎপর্য হলো, পুনরুত্থিত প্রভুর শক্তি আমাদের জীবনের সব ভয় ও হতাশা দূর করতে সক্ষম। যীশুর পুনরুত্থান হলো অন্ধকারের ওপর আলোর এবং নিরাশার ওপর আশার বিজয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈশ্বর মৃতপ্রায় যেকোনো পরিস্থিতিকে পুনরুত্থিত করে নতুন জীবন দিতে পারেন।
পয়েন্ট: পুনরুত্থান একটি ঐতিহাসিক সত্য―
যীশু খ্রীষ্ট কেবল ক্রুশে মৃত্যুবরণই করেননি, বরং তিনি তৃতীয় দিনে জীবিত হয়ে কবর থেকে উঠে এসেছিলেন। এটি কোনো রূপকথা নয়, বরং এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা।
বাইবেলের বাণী: ‘‘তিনি এখানে নেই, কারণ তিনি পুনরুত্থিত হয়েছেন, ঠিক যেমন তিনি বলেছিলেন।’’ (মথি ২৮:৬)
শিক্ষা: যিশু যা বলেছিলেন, তিনি তা পালন করেছেন। তাঁর পুনরুত্থান প্রমাণ করে যে তিনি কেবল একজন মহাপুরুষ নন, বরং তিনি জীবন্ত ঈশ্বর।
দ্বিতীয় বিষয় – পাপ ও মৃত্যুর ওপর বিজয়
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ভয় হলো মৃত্যু। যিশুর পুনরুত্থান আমাদের সেই ভয় থেকে মুক্তি দেয়। তিনি মৃত্যুর শক্তিকে পরাজিত করেছেন।
বাইবেলের বাণী: ‘‘হে মৃত্যু, তোমার জয় কোথায়? হে মৃত্যু, তোমার হুল কোথায়?’’ (১ করিন্থীয় ১৫:৫৫)।
শিক্ষা: খ্রিষ্টের পুনরুত্থানের মাধ্যমে পাপের বেতন যে মৃত্যু, সেই মৃত্যুর হাত থেকে আমরা চিরস্থায়ী জীবনের নিশ্চয়তা পেয়েছি।
তৃতীয় বিষয়: নতুন জীবনের নিশ্চয়তা ও আশা –
যীশুর পুনরুত্থান আমাদের কেবল ভবিষ্যতের আশা দেয় না, বরং বর্তমান জীবনেও এক নতুন উদ্দেশ্য দান করে। বাইবেলের বাণী: ‘‘যিনি খীষ্ট যীশুকে মৃতদের মধ্য থেকে পুনরুত্থিত করেছেন, তিনি তোমাদের মর্ত্য দেহকেও তাঁর আত্মার মাধ্যমে জীবন দেবেন।’’ (রোমীয় ৮:১১)।
শিক্ষা: আমরা যখন খ্রিষ্টে বিশ্বাস করি, তখন আমাদের পুরোনো পাপী স্বভাবের মৃত্যু হয় এবং আমরা এক পবিত্র ও নতুন জীবনে প্রবেশ করি। তিনি পুনরুত্থিত হয়েছেন বলেই আমরা আজ প্রতিকূলতার মধ্যেও আশাবাদী হতে পারি।
চতুর্থ বিষয়: অনন্ত জীবনের প্রতিশ্রুতি –
যীশুর পুনরুত্থান হলো আমাদের নিজেদের পুনরুত্থানের এক আগাম প্রমাণ বা ‘প্রথম ফল’।
বাইবেলের বাণী: ‘‘যীশু তাকে বললেন, ‘আমিই পুনরুত্থান ও জীবন; যে আমাতে বিশ্বাস করে, সে মরলেও জীবিত থাকবে।’’ (যোহন ১১:২৫)।
শিক্ষা: এই পৃথিবীই আমাদের শেষ ঠিকানা নয়। যীশু মৃত্যু জয় করেছেন বলে যারা তাঁকে বিশ্বাস করে, তারাও একদিন তাঁর সাথে স্বর্গে অনন্তকাল বাস করবে।
উপসংহার ;যীশুর পুনরুত্থান আমাদের জন্য কেবল একটি আনন্দ সংবাদ নয়, বরং এটি একটি পরিবর্তনের ডাক। আসুন আমরা পুনরুত্থিত প্রভুর শক্তিতে বলীয়ান হয়ে অন্ধকার থেকে আলোর পথে চলি। কারণ তিনি জীবিত, তাই আমাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত। আমাদের জীবনে নিয়ে আসুক পুনরুত্থানের অনাবিল সুখ-শান্তি আর সমৃদ্ধি। ঈশ্বর আমাদের সকলকে অযাচিত আশীর্বাদে পরিপূর্ণতা দান করুন।
পাস্টর কিশোর তালুকদার: খ্রীষ্টিয় ধর্মতত্ত্ববিদ।





Users Today : 35
Views Today : 36
Total views : 174589
